অটিজম হচ্ছে মস্তিষ্কের বিন্যাসগত সমস্যা । অটিজম শিশুদের মস্তিষ্ক বিকাশে এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকে, যার ফলে শিশু শুধুমাত্র নিজের মধ্যে আচ্ছন্ন থাকে, নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে । শিশু যখন শুধু নিজের মধ্যে আচ্ছন্ন থাকে তখন তার অন্যদের সাথে যোগাযোগ, সামাজিকতা, কথা বলা, আচরণ ও শেখা বাধাপ্রাপ্ত হয়।
হেনরি মোস্লে
ইদানিং অটিজম নিয়ে মানুষ কিছুটা জানলেও এ রোগটি আগে থেকেই ছিল। শনাক্তকরণ সম্ভব হয়নি বলেই রোগটিকে নতুন মনে হচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রথম ধারণা দেন হেনরি মোস্লে নামে একজন ব্রিটিশ সাইকিয়াট্রিস্ট ১৮৬৭ সালে। তিনিই প্রথম লক্ষ্য করেন যে কিছু কিছু শিশুর সামাজিক ও শারিরীক আচার-আচরণ এবং বুদ্ধিমত্তা অন্যন্য বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুদের থেকে আলাদা ।
লিও ক্যানার
পরবর্তীতে লিও ক্যানার, একজন আমেরিকান সাইকিয়াট্রিস্ট, ১৯৪৩ সলে এই অসুখের বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরেন এবং এর নাম দেন ইনফেনটাইল অটিজম ।
অটিজম শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশের একটি প্রতিবন্ধকতা যার লক্ষন সাধারণত শিশুর জন্মের ৩ বছরের ভিতরে প্রকাশ পায় ।অটিজম বলতে শুধুমাত্র একটি অসুখকে বুঝায় না, আসলে এটি কয়েকটি অসুখের সমষ্টি । যাকে বলে অটিজম স্পেক্ট্রাম ডিজঅর্ডার (Autism Spectrum disorder/ASD) । অটিজম আক্রান্ত শিশুদের ভিতরে সামাজিক আচার-আচরণ, যোগাযোগ ও ব্যবহারজনিত সামান্য সমস্যা থেকে শুরু করে প্রচন্ড সমস্যাগুলো ও এই স্পেকট্রাম এ অন্তর্ভুক্ত, যার ফলে সামান্য সমস্যা থেকে শুরু করে অধিক সমস্যাগ্রস্ত শিশুরা এর আওতায় চলে আসে।
অটিজম স্পেক্ট্রাম ডিজঅর্ডার (Autism Spectrum disorder/ASD) এর মধ্যে আছে-
১। ইনফেনটাইল অটিজম (Infantile Autism) - এইধরনের শিশুদের সামাজিক আচরণ, মৌখিক ও অমৌখিক যোগাযোগ (Verbal and Non Verbal Communication) ও ত্রিুয়াকলাপের সমস্যা এবং পুনারবৃত্তিমূলক আচরণ থাকে ।
২। রেটস সিনড্রম (Rett’s syndrome)- এই রোগ শুধু মেয়েদের হয়ে থাকে। এক বছর পর্যন্ত শিশুর বৃদ্ধি স্বাভাবিক থাকে । তারপর তার সামাজিক ও মানসিক বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায় । এরা কথা বলতে পারে না, এ রোগে আক্রান্ত শিশুরা প্রচন্ড রকমভাবে বুদ্ধি প্রতিবন্ধি হয়ে থাকে। এরা হাত-পা ও ঠিক ভাবে নড়াচড়া করতে পারে না ।
৩। এ্যাজপার্গার সিনড্রোম (Aspergar syndrome) - এ রোগ সাধারনত ছেলেদের হয় । এদেরকে অটিস্টিক সাইকোপ্যাথ বলা হয় । এরা কিছু কিছু কাজ বা আচরণ বার বার করতে থাকে । তবে কথা ঠিকমত বলতে পারে । যদিও কথা বলার ধরন এবং গলার স্বর একটু ভিন্ন রকম হয় । এরা একাকী এবং আলাদা থাকে । তবে কিছু কিছু ছোট ব্যাপারে এদের মধ্যে অধিক আগ্রহ দেখা যায় ।
৪। চাইল্ডহুড ডিজইনটেগ্রেটিভ ডিজঅর্ডার(Childhood Disintegration Disorder)- এর আরেক নাম হেলারস্ ডিজিস। এদের সাধারণত দুই বছর পর্যন্ত স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ ঘটে । পরবর্তীতে এদের সামাজিক আচরণের সমস্যা দেখা যায় । এদের সাধারনত Neurological problem প্রকট থাকে । এরা হাত পা সঠিকভাবে নাড়াচড়া করতে পারে না এবং নিজের প্রসাব-পায়খানার কথা বলতে পারে না ।
৫। এটিপিক্যাল অটিজম (Atypical Autism)
৬। অন্যান্য । (Pervasive Developmental Disorder - Not Otherwise Specified)
শিশুটি অটিস্টিক কিনা বুঝবেন কিভাবে ?
অন্য সকল শিশুর মতোই প্রত্যেক অটিজম আত্রুান্ত শিশু আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী । তাই একজন অটিস্টিক শিশুর মধ্যে যে বৈশিষ্ট্য থাকবে অন্য আরেকজন অটিস্টিক শিশুর মধ্যে সেই একই বৈশিষ্ট্য বা লক্ষণ নাও থাকতে পারে ।
তবে যে প্রধান তিনটি সমস্যা সকল অটিস্টিক শিশুর মধ্যে দেখা যায় তা হল ---
১। স্বাভাবিক সামজিকগত আচরণ সমস্যা (Social impairment)
২। মৌখিক ও অমৌখিক যোগাযোগ সমস্যা (Verbal and Non Verbal Communication Impairment)
৩। পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ এবং ত্রিুয়াকলাপ সমস্যা (Restricted & Repetitive activity & interest)
4। স্বাভাবিক সামজিক আচরণ সমস্যা (Social impairment)
- এরা সাধারনত একা একা থাকে ।
- অন্যদের সাথে মিশতে, খেলতে এবং কথা বলতে চায় না ।
- কথা বললেও অটিস্টিক শিশুরা অন্যের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে চায় না।
- মানুষের প্রতি আগ্রহ কম প্রদর্শন করে।
- কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক আচার আচরণের উন্নতি হলেও সামাজিক দায়িত্ব, ভাববিনিময় ও অপরের প্রতি সহানুভুতির সমস্যা রয়ে যায় ।
- অটিস্টিক শিশুদের আদর-ভালবাসার প্রতি আকর্ষন কম । যেমনঃ তাকে কোলে নেওয়া বা আদর করা সে পছন্দ করে না । তবে অনেক অটিস্টিক শিশু তার প্রতি বাবা মার স্নেহ-মমতা বুঝে ।
- বন্ধু বান্ধবের সাথে খুব কম মিশে ।
- অকারণে হাসে, কাঁদে বা ভয় পায় ।
- প্রথাগত শিক্ষার প্রতি আগ্রহ কম কিন্তু ছোট ছোট বস্তুর প্রতি আগ্রহ বেশি।
- বিপদ সম্পর্কে অসচেতন।
- যে কোন বিষয় কেউ কেউ অতিমাত্রায় সতর্ক আবার কেউ কেউ মোটেই সতর্ক নয়।
- অনেক বেশি শব্দ অপছন্দ করে।
